আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি নাঃ ড. মজুমদার

প্রকাশিত: ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫

চেঞ্জ নিউজঃ চব্বিশের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এই নতুন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রকৃত রক্ষাকবচ হিসেবে নাগরিকদের সচেতনতা ও সোচ্চার ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত “কোন পথে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ড. বদিউল আলম মজুমদার একাধারে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা, সংস্কারের রূপরেখা এবং শহীদদের রক্তের প্রতি দায়বদ্ধতার এক ঐতিহাসিক আহ্বান তুলে ধরেন।

তিনি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদানে গণভোটের অনিবার্যতা এবং আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের এক পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র ফুটিয়ে তুলেন।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি এবং এই রক্তের প্রতি আমরা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। তাই আমি আমার অবস্থান থেকে এই কাজটা করার চেষ্টা করছি। সুজনের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের সকলকে অনুরোধ করব যেন আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পক্ষে কাজ করবেন, যাতে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি এ সময় জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি প্রদানে গণভোটের জন্য নাগরিকদের উৎসাহিত করেন। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সরকারের কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, হতাশার অনেক কারণ আছে। কারণ এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে যে অতীতে গত ১৫-১৬ বছরে যে সকল অন্যায় অসংগতিগুলো হয়েছে, তার থেকে মুক্ত করার ব্যাপারে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যে। পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করে বিদায় নেওয়া। ইতোমধ্যে এই সরকার দুর্ভাগ্যবশত অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা ব্যর্থতা নিয়ে অনেক কথা বলতে পারি, কিন্তু এতে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। আমাদের অনেক হতাশা-নিরাশা ও প্রশ্ন থাকলেও যদি জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়, তবে প্রত্যাশা করি আমরা ভালোর দিকে যাব। আমরা সকলেই যদি মোমবাতি জ্বালানোর কাজটা করি, সচেতন ও সোচ্চার হই এবং সকলেই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করি তাহলেই হয়ত বা ভালোর দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিবে।

সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আপনারা জানেন যে এই সরকার গত বছরের অক্টোবরে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। তার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা কমিশন, সংবিধান সংস্কার, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনসহ ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং পরে আরও পাঁচটি গঠন করা হয়েছে। প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশন যখন তাদের রিপোর্ট পেশ করেছে আমি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলাম। এরপর সরকার ঐক্যমত কমিশন গঠন করেছে। ঐকমত্য কমিশন গঠন করে প্রথম ছয়টি সংস্কার কমিশনে যে সুপারিশগুলো করা হয়েছিল সেগুলো নিয়ে আমরা ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে ১৬৬ টি বেছে নিয়েছি যেগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ আলোচনা করা এবং ঐকমত্য সৃষ্টি করা দরকার। বাকিগুলো সরকার নির্বাহী আদেশে কিংবা অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং সেই তালিকাও সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এর অধিকাংশ হয়নি এবং কয়েকদিন আগেই আমি একটি আলোচনায় বলেছি যে আমি সন্তুষ্ট নই। সরকার যেগুলো করেছে আর বাকি পাঁচটি সংস্কার কমিশনের প্রায় সবগুলোই নির্বাহী আদেশ এবং সরকার ওই অধ্যাদেশের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারত, যা এখনো পারে এবং ভবিষ্যতেও পারবে।

তিনি আরও বলেন, সংস্কার কমিশনগুলোর ব্যাপারে রাজনৈতিক ঐক্যমত হওয়ার দরকার নেই, বিশেষত রাজনৈতিক ঐক্যমত হওয়ার দরকার আছে সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের ঐক্যমত সৃষ্টি হওয়া প্রসঙ্গে। আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটা স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চেয়েছিলাম। প্রথমে ১৬৬ টি স্প্রেডশিট তৈরি করে রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠিয়েছি এবং তাদের মতামত নিয়ে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের সাথে আমরা এককভাবে বসেছি। এরপর আমরা ৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে একত্রে বসেছি এবং আলাপ আলোচনার ভেতরে ৮৪টি বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত সৃষ্টির ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে এবং অধিকাংশ দল এটা স্বাক্ষর করেছে। এই ৮৪টির মধ্যে ৪৮টি আছে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত আর বাকি ৩৬টি সরকার অধ্যাদেশ এবং নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করতে পারবে। বাকি ৪৮টি বিষয়ে গণভোট হবে কারণ সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি। তাই জনগণের মতামত ছাড়া সংবিধান সংশোধন করা সমুচিন নয়। কতগুলো মৌলিক কাঠামো আছে যেগুলো সংসদেও সংস্কার করতে পারে না, এর জন্য গণভোট কিংবা গণপরিষদ দরকার।

মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবনা নিয়ে তিনি বলেন, এই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে একই সময় প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধান এবং সংসদের প্রধান হতে পারবেন না। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান যেগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকর করা হয়েছে, সেগুলোকে সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী করা। নির্বাচন কমিশনে যেন নুরুল হুদার মত ব্যক্তিরা নিয়োগ না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা এবং বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করা যেন অতীতের মত কারসাজি না হয়। নারী কমিশন নিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নারীর ন্যায্য অধিকার পরাজিত হয়েছে কিন্তু পুরুষতন্ত্র জয়ী হয়েছে। আমি বহু লড়াই করেছি নারীর অধিকার নিয়ে কিন্তু সফল হইনি কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়নি।

নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেকের মতো আমারও সন্দেহ আছে নির্বাচন করা যাবে কি না কারণ আমাদের সংস্কার প্রস্তাবগুলোর অধিকাংশ বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রায়ণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের প্যানেল তৈরির যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম তার কোনটাই রাখা হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে লড়েও প্রতিকার পায়নি, যেখানে আমি নিজেও তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম। তবে আমাদের হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই কারণ আমরা এই কাজটা করছি আমাদের নিজেদের ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য। আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি এবং এই রক্তের প্রতি আমরা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। তাই সুজনের পক্ষ থেকে আমি সকলকে অনুরোধ করব যেন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তোরণের মধ্য দিয়ে একটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় এবং গণভোট যেন নির্বাচিত হয়, কারণ গণভোট পাশ না হলে আবারও পুরান অবস্থায় আমরা ফিরে যাব যা কারো জন্য কাঙ্ক্ষিত হবে না।

সুজনের জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েলের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুল হক আশুর সঞ্চালনায় আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম, গণতান্ত্রিক আইনজীবী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শংকর রায়, নারায়ণগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ড. ফজলুল হক রুমন রেজা, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি, নগর ভাবনার আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস, সাবেক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী মাওলানা মইনুদ্দিন আহমাদ, বাসদের সেলিম মাহমুদ এবং এনসিপির আহমেদুর রহমান তনুসহ স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।